টাঙ্গাইল জেলা কেন বিখ্যাত? | টাংগাইল জেলা

টাংগাইল জেলা | টাঙ্গাইল জেলা কেন বিখ্যাত? - এই জেলাটি বিখ্যাত হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে । এই জেলার ভৌগলিক কারন, বিখ্যাত ব্যাক্তিবর্গ, বিখ্যাত স্থান, বিখ্যাত খাবার, বিখ্যাত পন্য, নামকরনের ইতিহাস, আয়তনের দিক থেকে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বিভিন্ন কারনে বিখ্যাত । এই জেলা কেন বিখ্যাত, এই আর্টিকেলটি পড়লে আপনারা সব বুঝতে পারবেন ।


টাঙ্গাইল জেলা কেন বিখ্যাত?


আরও পড়ুন: যশোর জেলার উপজেলা | যশোর জেলার থানার নাম | যশোরের বিখ্যাত স্থান সমুহ

টাঙ্গাইল জেলা পরিচিতি

টাঙ্গাইল জেলা ঢাকা বিভাগের অন্যতম একটি প্রশাসনিক অঞ্চল । বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত । টাঙ্গাইল জেলার পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ, পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর, দক্ষিণে অবস্থিত ঢাকা ও মানিকগঞ্জ এবং উত্তরে অবস্থিত জামালপুর জেল ।

উপজেলার সংখ্যানুসারে টাঙ্গাইল বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা । টাঙ্গাইল জেলার আয়তন প্রায় ৩৪১৪.৩৫ বর্গ কিমি বা ১৩১৮.২৯ বর্গমাইল । এই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ লক্ষ । টাঙ্গাইল জেলা ১২ টি উপজেলা এবং ১১৮ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত । টাঙ্গাইল জেলা ঢাকা বিভাগের আয়তনের ভিত্তিতে সর্ববৃহৎ এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে ২য় সর্ববৃহৎ জেলা ।

১৯৬৯ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল ছিল অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা । ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয় । এটি একটি নদী এলাকা সমৃদ্ধ কৃষিপ্রধান অঞ্চল । টাঙ্গাইল জেলা বাংলাদেশের অন্যতম ও বৃহৎ নদী যমুনার তীরে অবস্থিত এবং টাঙ্গাইল জেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে লৌহজং নদী ।

টাংগাইল জেলার নামকরণের ইতিহাস

টাঙ্গাইলের নাম করণের বিষয় নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতি ও নানা মত । ১৭৭৮ সালে প্রকাশিত রেনেল (মেজর জেমস রেনেল, যিনিএকজন ব্রিটিশ ভূবিদ, ভূগোলবিদ) তার মানচিত্রে এ সম্পূর্ণ এলাকাকে আটিয়া বলে উল্লেখ করেছেন । ১৮৬৬ সালের আগে টাঙ্গাইল নামক কোনো স্থানের উল্লেখযোগ্য প্রমান পাওয়া যায়নি ।

টাঙ্গাইল নামটি পরিচিতি লাভ করে ১৮৭০ সালের ১৫ নভেম্বর তখনকার মহকুমা সদর দপ্তর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে স্থানান্তরের সময় থেকে । টাঙ্গাইলের অতি প্রবিন ইতিহাস প্রণেতা খন্দকার আব্দুর রহিম সাহেবে মনে করতেন, ইংরেজ আমলে এদেশের লোকেরা উচু শব্দের পরিবর্তে ‘টান’ শব্দই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল বেশি । এখনো টাঙ্গাইল অঞ্চলে ‘টান’ শব্দের প্রচলন আছে । এই টানের সাথে আইল শব্দটি যুক্ত হয়ে হয়েছিল । সেই বিখ্যাত “টান” শব্দ আর “আইল” শব্দ একত্রে মিলে হয়েছে বর্তমান টাঙ্গাইল ।

টাংগাইলের উপজেলা কয়টি?

টাঙ্গাইল জেলায় মোট উপজেলার সংখ্যা ১২ টি । যথা -

টাঙ্গাইল সদর উপজেলা, কালিহাতি উপজেলা, ঘাটাইল উপজেলা, বাসাইল উপজেলা, গোপালপুর উপজেলা, মির্জাপুর উপজেলা, ভূঞাপুর উপজেলা, নাগরপুর উপজেলা, মধুপুর উপজেলা, সখিপুর উপজেলা, দেলদুয়ার উপজেলা, ধনবাড়ী উপজেলা ।

টাঙ্গাইলের ইউনিয়ন সংখ্যা কয়টি?

টাঙ্গাইল জেলায় মোট ইউনিয়নের সংখ্যা ১১৮ টি । যথা –

ঝাওয়াইল, নগদাশিমলা, হাদিরা, হাবলা, বাসাইল, ফুলকী, কাশিল, কাঞ্চনপুর, কাউলজানী, সাগরদিঘী, লক্ষিন্দর, সংগ্রামপুর, রসুলপুর, লোকেরপাড়া, সন্ধানপুর, ধলাপাড়া, দেওপাড়া, আনেহলা, দিঘলকান্দি, দিগড়, জামুরিয়া, ঘাটাইল, দেউলাবাড়ী, সহদেবপুর, সল্লা, বীরবাসিন্দা, বাংড়া, বল্লা, পারখি, পাইকড়া, নারান্দিয়া, নাগবাড়ী, দুর্গাপুর, দশকিয়া, গোহালিয়াবাড়ী, কোকডহড়া, বাঘিল, দাইন্যা, হুগড়া, মাহামুদনগর, মগড়া, কাতুলী, কাকুয়া, সিলিমপুর, পোড়াবাড়ী, গালা, ঘারিন্দা, করটিয়া, হেমনগর, আলমনগর, মির্জাপুর, ধোপাকান্দি, মহেড়া, ফতেপুর, জামুর্কী, বানাইল, আনাইতারা, ভাতগ্রাম, ওয়ার্শী, বহুরিয়া, শোলাকুড়ি, মির্জাবাড়ী, গোলাবাড়ী, আউশনাড়া, আরণখোলা, আলোকদিয়া, মোকনা, পাকুটিয়া, মামুদনগর, দপ্তিয়র, ভাদ্রা, ধুবরিয়া, সলিমাবাদ, বেকড়া, গয়হাটা, সহবতপুর, ভাররা, নাগরপুর, নিকরাইল, অলোয়া, গোবিন্দাসী, গাবসারা, অর্জুনা, ফলদা, ভাওড়া, লতিফপুর, বাঁশতৈল, আজগানা, তরফপুর, গোড়াই, বলিভদ্র, মুশুদ্দি, যদুনাথপুর, ধোপাখালী, পাইস্কা, বানিয়াজান, বীরতারা, এলাসিন, দেউলী, দেলদুয়ার, লাউহা্টী, পাথরাইল, ফাজিলহাটি, ডুবাইল, আটিয়া, হাতীবান্ধা, যাদবপুর, বহেড়াতৈল, দাড়িয়াপুর, গজারিয়া, কালিয়া, কালমেঘা, কাকড়াজান ।

টাংগাইল জেলায় কয়টি থানা?

টাঙ্গাইল জেলা মোট ১৩টি থানা । যথা -

টাঙ্গাইল মডেল থানা, নাগরপুর থানা, দেলদুয়ার থানা, মির্জাপুর থানা, বাসাইল থানা, সখিপুর থানা, কালিহাতী থানা, ঘাটাইল থানা, ভূঞাপুর থানা, ধনবাড়ী থানা, মধুপুর থানা, গোপালপুর থানা, এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা ।

টাংগাইল জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্তদিবস। জেলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইলকে মুক্ত করে উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা । মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের কাহিনী দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র । ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের আগেই শত্রুমুক্ত হয় টাঙ্গাইল । মুক্তির নিঃশ্বাস নেয় স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেলিত টাঙ্গাইলবাসী ।

টাংগাইল জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী – ধনবাড়ীর নবাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা (২৯ ডিসেম্বর, ১৮৬৩ -১৭ এপ্রিল, ১৯২৯) ।

আবদুল হামিদ খান ভাসানী – ব্রিটিশ আমলের ভারত উপমহাদেশের অন্যতম এবং বিশিষ্ট তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণ-আন্দোলনের নেতা (ডিসেম্বর ১২, ১৮৮০-নভেম্বর ১৭, ১৯৭৬) ।

অমৃতলাল সরকার – ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব, বিপ্লবীঅনুশীলন দলের সভ্য (১৮৮৯ – ৪ এপ্রিল, ১৯৭১) ।

প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ –বাংলাদেশের ততকালিন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক (১৮৯৪ – ২৯ মার্চ, ১৯৭৮) ।

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা –বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট বিখ্যাত সমাজসেবক এবং দানবীর ব্যাক্তি (নভেম্বর ১৫, ১৮৯৬ – মে ৭, ১৯৭১) ।

কানাই লাল নিয়োগী - বাংলা ভাষা আন্দোলন সংগ্রামে নিহত ব্যক্তিত্ব (১৯২৪ -১৯ মে ১৯৬১) ।

সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী - বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) টাঙ্গাইলস্থ ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র (১৯১০ – ৩০ মে , ১৯৮১) ।

প্রতুল চন্দ্র সরকার - ভারতবর্ষের বিখ্যাত জাদুকর। তিনি অন্যতম একজন আন্তর্জাতিক জাদুকর ছিলেন যিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তার জাদু দেখিয়েছেন (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৩ – ৬ জানুয়ারি ১৯৭১) ।

বেগম ফজিলতুন-নেসা - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ছাত্রী ও ঢাকা ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন (১৮৯৯ – ২১ অক্টোবর, ১৯৭৭) ।

শামসুল হক - বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৮ – ১৯৬৫) ।

আবু সাঈদ চৌধুরী - বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি (জানুয়ারি ৩১, ১৯২১ – আগস্ট ১, ১৯৮৭) ।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি - বাংলাদেশের একজন শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ২০০২ সালে একুশে পদক লাভ করেন (জন্মঃ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৩৫) ।

রফিক আজাদ – একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশী কবি, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রসিদ্ধ পত্রিকা সম্পাদক (জন্ম: ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১) ।

বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী - এর মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাঘা কাদের নামে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনীগড়ে ওঠে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমরনায়ক (জন্ম: ১৯৪৭) ১৯৭১ ।

মামুনুর রশীদ - একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চ আন্দোলনের পথিকৃত (২৯ ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৮) ।

মান্না – এদেশের একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজক ছিলেন (১৯৬৪ – ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০০৮) ।

টাঙ্গাইলের বিখ্যাত খাবার

টাঙ্গাইলের বিখ্যাত একটি খাবারের নাম হলো পোড়াবড়ির চমচম । পোড়াবাড়ির চমচমের রয়েছে প্রায় দুইশত বছরের ইতিহাস । এক সময় এ চমচমের “রাজধানী” হিসেবে পরিচিত ছিল পোড়াবাড়ি গ্রামটি । এই অঞ্চলটি টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । প্রায় দুইশত বছর আগে “যশোরথ হাল” নামের পোড়াবাড়ির এক কারিগর প্রথম এ মিষ্টি তৈরি করেন । তখন থেকেই এই মিষ্টি “পোড়াবাড়ির চমচম” নামে বিখ্যাত ।

টাঙ্গাইলের বিখ্যাত শাড়ি

টাঙ্গাইল জেলার তাঁতশিল্প এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন কুটিরশিল্প । টাঙ্গাইলের শাড়ির প্রাচীন কাল থেকেই বিশ্বজুড়ে সামদৃত । এই শাড়ির রয়েছে প্রায় দুইশত বছরের ইতিহাস । এই বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী শাড়ি টাঙ্গাইল জেলাতেই তৈরী হয় । এ জন্য এই শাড়ি এই জেলা অর্থাৎ টাঙ্গাইল জেলার নামেই নামকরণ করা হয়েছে । টাঙ্গাইলের শাড়ি নামেই বিশ্বব্যাপি এক নামে পরিচিত ।

টাংগাইল জেলার বিখ্যাত স্থান

অলোয়া জমিদার বাড়ি, আতিয়া মসজিদ, আদম কাশ্মিরী, করটিয়া জমিদার বাড়ি, কাদিমহামজানি মসজিদ, গুপ্ত বৃন্দাবন, টাঙ্গাইল ডিসি লেক, টাঙ্গাইল পৌর উদ্যান, ধনবাড়ী জমিদার বাড়ি, ধনবাড়ী মসজিদ, নাগরপুর চৌধুরীবাড়ী, পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, বঙ্গবন্ধু সেতু, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, মহেরা জমিদার বাড়ি, সাগরদিঘী ইউনিয়ন, হেমনগর জমিদার বাড়ি ইত্যাদি ।

“টাঙ্গাইল জেলা কেন বিখ্যাত” আশা করি তা বুঝতে পেরেছিন । আপনাদের যদি আরও কিছু জানার থাকে তাহলে কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করতে ভুলবেন না । আর প্রতি নিয়ত আপডেট সব পোস্ট এবং আর্টিকেল পড়তে চোখ রাখুন বাংলা আইটি ব্লগ ৩৬০ ব্লগে ।। ধন্যবাদ ।।


আরও পড়ুন: ২ হাজার টাকার মোবাইল || মোবাইল কিনুন মাত্র ২ হাজার টাকায়

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url